ছোট বর, বড় বর/ পরপুরুষ ও বরপুরুষ

ছোট বর, বড় বর/ পরপুরুষ ও বরপুরুষ

তৃষ্ণা বসাক

 

বড় বর মাছ চেনে। সে বাজারে গেলে রাজ্যের মাছ উঠিয়ে আনে। যত রকম বাঙ্গাল মাছ আড়, বোয়াল, মেনি, কাজুলি, এমনকি  রাইখর মাছ, যা নাকি সারা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র আত্রেয়ী নদীতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে যত রকম ঘটি মাছ- ভেটকি, ভাঙন, তোপসে। সেসবও আনে। আর ঘটি -বাঙ্গাল ভেদাভেদহীন ইলিশ চিংড়ি তো বটেই। এমনকি খুদে খুদে কাঁচকি মাছ। সেসব মাছ ধুতে ধুতে পাক্কা তিনঘণ্টা। কাঁকাল ব্যথা হয়ে যায় এলোকেশীর। তবে হ্যাঁ, খেয়ে সুখ।

ছোট বর আবার রুই আর কাতলার তফাতই বোঝে না। যদি কখনো ঠেকায় পড়লে বাজার যেতে হয়, খানিকটা চিকেন কিনে নিয়ে  চলে আসে। ক্বচিৎ কখনো  মাছ আনলে  অবধারিত পচা হবে, টান মেরে ফেলে দেয় এলোকেশী। তবে সে টকাটক মোবাইল টিপে ওলা, উবের বুক করতে পারে। শহরের কোন রেস্তোরায় জাপানী সুশি আর কোথায় লেবানিজ র‍্যাপ পাওয়া যায় –সেসব তার নখদর্পণে।  ইংরেজি আর হিন্দিও বলে মাতৃভাষার মতো। তার সঙ্গে ঘুরে সুখ। তবে তখন শাড়ি টাড়ি, সোনার মানতাসা, কানপাশা, সীতাহার মোটেই পরতে পারবে না এলোকেশী। মিনিও নয়, পরতে হবে মাইক্রো স্কার্ট আর সঙ্গে ক্রপড টপ, আর রঙ্গিন বিডসের মালা।

পশ্চিমী পোশাক আবার বড় বরের দু চক্ষের বিষ। সে পছন্দ করে ভারি ভারি সিল্কের  জমকালো শাড়ি, সোনার গয়না, এমনকি সোনা বাঁধানো শাঁখা পলা পর্যন্ত  আর ডগডগে সিঁদুর। খাওয়ার শেষে এক খিলি মিঠেপাতা পান, গুলকন্দ আর চমন বাহার দেওয়া।
ছোট বরের সঙ্গে বেরোলে সে আবার পীড়াপিড়ি করবে ‘একটা ব্ল্যাক ডগ ছোট্ট করে বানিয়ে দি?’ কিংবা এলোকেশীই তার মন রাখতে একটা ব্লু অ্যান্টিকুইটি নিয়ে আরাম করে সিপ করবে।

কাউকে ফেলতে পারে না এলোকেশী। ঘর ছোট, তার থেকেও ছোট এই জীবন। এক জীবনে এত ভালবাসা আঁটানো মুশকিল। আরও মুশকিল হচ্ছে তার একটিই শোবার ঘর, তাতে একটিই আলমারি। আলমারির একদিকে যেমন তসর, মুগা, অন্যদিকে হট প্যান্ট, ক্রপড টপ, তেমনি বিছানায় তার এক পাশে বড় বর, অন্যপাশে ছোট বর। আলমারির জামাকাপড় বছরের পর বছর পাশাপাশি থেকে যায়, রা না কেটে। বড় বর, ছোট বর মোটেই সে রকম না। তারা ছুতোয় নাতায় নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবে, সে টিভির চ্যানেল হোক, বিজেপি তৃণমূল হোক কি চেলসি বার্সিলোনা হোক। বড়টি ফুটবল পাগল, ছোটটি ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ। বড় বলে ‘এলো, সাবধানে থেকো, ও কিন্তু চূড়ান্ত বারবারাস, কোনদিন না তোমাকে মেরে ফেলে।’ ছোট নাক সিঁটকে বলে ‘এলি ডিয়ার, সেই মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল, হাউ ব্যাকডেটেড, তুমি ওকে স্ট্যান্ড করো কী করে!’ ওরা চিৎকার শুরু করলে সুট করে বিছানা থেকে নেমে আসে এলোকেশী, ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে, গাদাগাদা সেলফি তুলে পোস্ট করে, চ্যাট করে বন্ধুদের সঙ্গে। বড় বর আবার এসব মোটেই পছন্দ করে না, ছবি পোস্ট করলে সারাদিন অশান্তি লেগে থাকে। কেউ যদি সেই ছবিতে লাভ ইমোজি দ্যায়, তবে আর দেখতে হবে না। তাকে আনফ্রেন্ড, ব্লক করিয়ে তবে তার শান্তি। ছোটটি আবার এসব বিষয়ে ভারি স্পোর্টিং। যত ইচ্ছে ছবি দাও, এমনকি মরিশাসের সুইম সুট পরা ছবি না দিলে সে রাগ করে। এত কষ্ট করে ঘুরতে আসা তবে কীসের জন্যে? সেসব ছবি পোস্ট করার সময় এলোকেশীকে খুব সাবধানে বড়টিকে বাদ দিয়ে রাখতে হয়। এসব কারিকুরি তাকে ছোটটিই শিখিয়েছে, হেভি টেক স্যাভি সে। এমনকি যাবতীয় প্রোফাইল হ্যাক করাও তার নখদর্পণে। বান্ধবীদের সঙ্গে কিটি পার্টিতে এলোকেশী জাঁক করে বলে ‘জানিস তো, আমার ছোটটি খুব বড় মাপের হ্যাকার’ বড়টি  যে কম্পিউটারে ক অক্ষর গোমাংস – সে কথা অবিশ্যি সে চেপে যায়, পতিনিন্দা মহাপাপ নরকে গমন, তা কি সে জানে না?

রাগ করে সোফায় শুলেও  কি শান্তি আছে, বড় বরের হেবি জমিদারি মেজাজ, নিজেকে কী না কী মনে করে সে, মোটেই আসে না রাগ ভাঙ্গাতে এলোকেশীর। বরং চায় এলোকেশী গিয়ে তার পা টিপে, কোমর টিপে সেবা করুক। ছোট বর কিন্তু একদম সহ্য করতে পারে না এলোকেশীর মনখারাপ। সে ঠিক এসে হাজির হয় তার রাগ ভাঙ্গাতে। পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে, ঘাড়ে ফুঁ দিয়ে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যায় ঘরে। আর একদিন সেই নিয়েই বাধল মুশকিল। ছোট বর ওইভাবে এলোকেশীকে ঘরে নিয়ে আসছে দেখে হাড় জ্বলে গেল বড়র। একে ইস্টবেংগল দু গোলে পিছিয়ে আছে, তার মধ্যে এসব দেখলে কার না রাগ হয়? সে চেঁচিয়ে বলল ‘আমার বাড়িতে এসব সিনসিনারি চলবে না। আভি নিকালো’

ছোট বর অমনি দুম করে নামিয়ে দেয় এলোকেশীকে। সোজা রিমোট কেড়ে নিয়ে বলে ‘গেট লস্ট। আমি ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ দেখব। তুমি গিয়ে ততক্ষণ কাঁটা চচ্চড়ি দিয়ে ভাত গেলো চাড্ডি। এলি, আমার জন্যে একটা পিতজা অর্ডার করবে প্লিজ?’এলোকেশী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে খানিক।  হেব্বি লেগেছে  তার কোমরে অমন দুম করে নামিয়ে দেওয়ার জন্যে। তার চেয়েও লেগেছে মনে ‘আমার বাড়ি’ শুনে। বাড়ি তার। এ দুটোকে তো সে-ই বার করে দিতে পারে যখন তখন।তাই কি পারা যায় তবু? আহা বড়টা মাছ চেনে ভালো, আর ছোট ছাড়া তার যাবতীয় অনলাইন ঝক্কি কেই বা সামলাবে? কিন্তু একদিনের জন্যে ব্লক করাই যায় তো। সে রিমোট কেড়ে নিয়ে দুজনকে বলে ‘আমি এখন সিঁথির সিঁদুর চেটেছে ইঁদুর দেখব। তোমরা রান্নাঘরে গিয়ে ততক্ষণ রাতের রান্নাটা সেরে ফেলো। আজ নো ডাইনিং আউট। কড়াইশুঁটির কচুরি আর ছোট আলুর দম। আলুর খোসা খুব সাবধানে ছাড়িও। আর কড়াইশুঁটির সঙ্গে আদা আর কাঁচালংকা বাটতে ভুলো না যেন’

ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে এক ডেকচি কড়াইশুঁটি, অন্য প্রান্তে এক গামলা ময়েন দেওয়া ময়দা, মাঝখানে একটা প্রেসার কুকার ভর্তি ছোট আলু, সেদ্ধর অপেক্ষায়। টিভির আওয়াজ আসে এখানে, এলোকেশীর হাসির শব্দ, কার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ছে এলোকেশী। টেবিলের দু প্রান্তে  বড় ময়দা আর ছোট কড়াইশুঁটি নিয়ে বসবে কি? নাকি আলুটাই আগে সেদ্ধ বসাবে? তীব্র সংশয় আর ঘৃণা নিয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকে তারা।

তৃষ্ণা বসাক
পুকুরঘাট

পুকুরঘাট

একদিন আমরা মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে পুকুরঘাট নামের একটি মেয়েদের ভার্চুয়াল দল খুলে ছিলুম। অচিরেই সে কয়েকটি সদস্যের দল কয়েক হাজার সদস্যের মেয়েদের দল হয় ওঠে। পুকুরঘাট দলের মত এত গুণী মেয়েদের সমাহার বাংলাদেশে খুব কম ভার্চুয়াল দলে আছে। কাজেই সেই দল সেখানেই আটকে থাকবে না বলা বাহুল্য। তাই পুকুরঘাট দলের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে প্রকাশিত হলো পুকুরঘাট পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 thoughts on “ছোট বর, বড় বর/ পরপুরুষ ও বরপুরুষ

  1. তৃষ্ণার এলোকেশী কে বেশ লাগলো।দুই প্রজন্ম কে ভালো ধরেছেন

  2. দারুণ লেখা দিদি। মজার কনফ্লিক্ট!

  3. দুর্দান্ত! কচুরি আর আলুরদমের ভরপুর খুশি ভরিয়ে দিল মন।

  4. উফফফফ এলোকশী তোমায় হিংসে করলাম

  5. ছোট বর বড় বর। ফাটাফাটি লেখা। উপভোগ্য।


Warning: Trying to access array offset on value of type bool in /home/u622732489/domains/pukurghat.in/public_html/wp-content/themes/cream-magazine-child/single.php on line 52